প্রাচীন পীড়ার কারণ ও তাহার চিকিৎসা
অনেকেই পীড়া বিশেষের নিদান লইয়া নানা মতামত ও আলোচনা বিষয়ে এত ব্যস্ত থাকেন যে, আসল কাজে বড় একটা সময় পান না। কিন্তু প্রকৃত হোমিওপ্যাথির পন্থাবলম্বিদের পক্ষে এরূপ করা কতকটা বৃথা পরিশ্রম এবং কতকটা আসলতত্ত্ব হারাইয়া অলীকপথের অনুসরণ মাত্র, বলা যাইতে পারে। অনেকে ম্যালেরিয়া উৎপত্তি বিষয়ে নানা মত প্রকাশ করিয়া থাকেন। কেহ বলেন-দূষিত জলে ম্যালেরিয়ার বীজ জন্মে এবং এক প্রকার মশককুল এই বীজ বহন করিয়া মনুষ্যদেহে সঞ্চারিত করে। কেহ বা অনেক গবেষণার দ্বারা আরও অন্য প্রকার কারণ আবিষ্কার করেন। এই নিদান বাহির করিবার জন্য সরকার বাহাদুর লক্ষ লক্ষ মুদ্রা খরচ করিয়াছেন ও করিতেছেন। এলোপ্যাথি মতে নিদানের বিপরীত চিকিৎসাই অনুমোদিত, কাজেই এলোপ্যাথের পক্ষে এইরূপ নিদান অনুসন্ধান কর্তব্য হইতে পারে। কিন্তু যিনি প্রকৃত হোমিওপ্যাথিতত্ত্বে প্রবেশ করিয়াছেন-তিনি জানেন যে, পীড়ার নিদান বাহিরে নহে, বাহিরের নিদান কেবলমাত্র উত্তেজক কারণ। আগন্তুক ব্যাধি (যথা-বৃক্ষ হইতে পতনজনিত আঘাত বা অস্ত্রাঘাত বা অগ্নিদাহ ইত্যাদির কথা স্বতন্ত্র) প্রকৃত পীড়া পদবাচ্য নহে। প্রকৃত পীড়ার নিদান, বাহিরে নহে ভিতরে। ম্যালেরিয়াপূর্ণ স্থানে এরূপ বহুলোক আছেন যাঁহারা আদৌ ম্যালেরিয়াক্রান্ত হন না-ইহার কারণ কি, চিন্তা করা উচিৎ। যিনি প্রকৃত হোমিওপ্যাথ তিনিই জানেন যে, কোনও ব্যক্তির জ্বরের বিশেষ লক্ষণের সহিত জেলসিমিয়ামের বিশেষ লক্ষণের মিল থাকিলে, সে জ্বর জেলসিমিয়ামের দ্বারাই সারিবে, সে জ্বর ম্যালেরিয়া জনিতই হউক, অথবা অন্য কোনও কারণেই হউক এলোপ্যাথের জানা আবশ্যক যে, এই জ্বর ম্যালেরিয়া জ্বর, তাহা হইলেই তিনি জীবাণুনাশক কুইনাইন দিবেন। আপনি হোমিওপ্যাথ, আপনার জানিয়া লাভ কি, ইহা ম্যালেরিয়া জ্বর, কি বসন্ত জ্বর, কি দুর্ভিক্ষ জ্বর, যেহেতু আপনি জেলসিমিয়াম ব্যতীত অন্য ঔষধ দিতেন পারিবেন না। আর সেই ম্যালেরিয়া বীজ মশকেই আনুক বা অন্য কোনও উপায়ে আসুক, আপনার কার্যে এ সকল বিষয়ে কিছুই সহায়তা করিতে পারিবে না। আপনার আবশ্যক ভৈষজ্যতত্ত্ব হইতে প্রত্যেক ঔষধটির লক্ষণগুলি মনে রাখা এবং ঔষধের বিশেষ লক্ষণআপনার রোগীর বিশেষ লক্ষণের সহিত মিল হইলে, তাহা প্রয়োগ করা। এই জ্বর ম্যালেরিয়া জনিত কিনা বা এই ম্যালেরিয়ার কারণ কি, এ সকল চিন্তায় বৃথা সময় নষ্ট করিবার প্রয়োজন কি? আপনার চিকিৎসা নিদান অনুসারে নহে, আপনার কোনও 'বীজাণু' নাই বা তাহার বিনাশকল্পে ঔষধ দিবার ব্যবস্থা আপনার নহে, অবশ্যই এ কথা স্বীকার করিতে হইবে যে, পীড়ার বাহিরের কারণ অর্থাৎ উত্তেজক কারণ বিষয়েও জ্ঞান আবশ্যক-কিন্তু চিকিৎসকের পক্ষে ততটা নহে, গৃহস্থের পক্ষে বটে, যেহেতু উক্ত উত্তেজক কারণসমূহ ত্যাগ করিয়া চলিতে পারিলে পীড়ার হাত হইতে অনেকটা অব্যাহতি লাভ হইতে পারে। চিকিৎসকের বিশেষতঃ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের এ সকল কারণতত্ত্ব অনাবশ্যক। ভিতরের কারণের প্রতি লক্ষ্য না করিয়া বাহিরের কারণ লইয়া ব্যস্ত হইলে আরও বিপদ আছে। যদি জেলসিমিয়ামের লক্ষণযুক্ত রোগী জেলসিমিয়ামে বা সারিল বা কিছুদিন ভাল থাকিয়া পুনরাক্রমণ হইল, তখন মনে হইবে যে, জ্বর চিকিৎসায় কুইনাইন ব্যতীত কোনও ঔষধ নাই-হোমিওপ্যাথিতে জ্বরের প্রতিকার নাই-ইত্যাদি। যদি অন্তর্দৃষ্টি থাকে, তবে রোগীর লক্ষণের মধ্যে সোরা বিষ বা প্রমেহ বিষ বা উপদংশ বিষ ইহাদের মধ্যে দুইটি বা তিনটির লক্ষণ বিদ্যমান রহিয়াছে দেখা যাইবে এবং বুঝা যাইবে যে গুপ্ত শত্রু শরীরে থাকিয়া ঔষধের কার্য স্থায়ী হইতে দিতেছে না-তখন তাহার প্রতিবিধানকল্পে সোরা বিষনাশক বা সাইকোসিস বিষনাশক বা উপদংশ বিষনাশক যেরূপ প্রয়োজন, সেইরূপ ঔষর নির্বাচন করিয়া প্রয়োগ করিতে হইবে। ফলতঃ যদি অন্তর্দৃষ্টি না থাকে, তবে কিরূপে এ প্রণিধান আসিবে? কারণানুযায়ী ঔষধ সময়ে সময়ে আবশ্যক হইতে পারে-যথা, সন্তরণজনিত সর্দি বা অঙ্গ বেদনা। রাত্রি জাগরণজনিত উদরাময় ইত্যাদি হঠাৎ পীড়া উপস্থিত হইলে, ঐ ঐ কারণসমূহ পীড়ার লক্ষণাবলীর মধ্যে একটি লক্ষণ হইবে বটে, কিন্তু তাহা হইলেও লক্ষণসমষ্টিই ঔষধ নির্বাচন করিবে, কারণমাত্র লইয়া ঔষধ দেওয়া চলিবে না। প্রকৃত হোমিওপ্যাথি পথে তিনটি প্রধান সহায়-১। 'সমঃ সমঃ শময়তিঃ',- এই সূত্র। ২। স্বল্পতম বা সূক্ষ্মতম মাত্রা। ৩। একই সময়ে একটি মাত্র ঔষধ প্রয়োগ। আরও আছে, কিন্তু এই তিনটিই একেবারে মৌলিক পীড়ার প্রকৃত নিদান।
The cause of ancient disorders
and its medical forecasting is the actual diagnosis of the first paragraph (1) Many people are so busy with various opinions and discussions that they do not get a big time in the real work. But it can be said that it is a futile effort for the followers of true homeopathy to do so and it is just following an illusion by losing some of the originality. Many people express different opinions about the origin of malaria. Some say malaria seeds grow in contaminated water and a type of mosquito carries the seeds. Translates to the human body. Some or many research discover other types of reasons. The government has spent and spent millions of coins to exclude this diagnosis. According to allopathy, the opposite treatment of Nidan is approved, so it may be such a schedule for allopath. But one who has entered into true homoeopathy knows that the diagnosis of the affliction is not external, the external diagnosis is only the aggravating factor. Accidental injury (such as injury caused by falling from a tree or stab wounds or burns etc.) is not a term for actual injury. The diagnosis of real pain is not external but internal. There are many such places in the malarian place, who should not be malaria at all-what is the reason for it. A true homoeopath knows that if the peculiar symptoms of Gelsemium coincide with the particular symptoms of a person's fever, that fever will be cured by Gelsemium, whether the fever is due to malaria, or from any other cause. Quininewill giveYou are a homeopath, what is the use of you knowing, whether it is malarial fever, spring fever, famine fever, as you cannot give any medicine other than Gelsemium. And that malaria seed, whether carried by mosquitoes or by some other means, will not help your cause in any way. You must remember the symptoms of each medicine from the herbal and the special symptoms of the medicin If your patient is in line with the special symptoms, apply it. Whether this fever is caused by malaria or the cause of these malaria, what is the need to waste time in all these thoughts? It is not to be a 'germ' or none of you in the medical diagnosis, you are not your 'arrangement for the destruction of it, it must be acknowledged that the cause of the outbreak, that is, the cause of the provocative cause-is not as much for the doctor, for the household, since. Leaving these provocative causesIf you can go, there may be a lot of escape from the hands of the pain.All these causes of the physician, especially the homeopathic physician, are unnecessary. If you are busy with the outside reason, there is more danger to the outside reason. If the symptom of gelsemium is not in the gelsemium or for some time, it seems that there is no medicine except quinine in the treatment of fever, there is no fever remedy in the homiopathy. If there is insight, it will be seen that two or three of the symptoms of Psora poison or Prameha Bib or Upadangas poison are present in the patient's symptoms and it will be understood that the secret enemy is not allowing the action of the medicine to persist in the body - then Psora antidote or psychosis antidote or AntidepressantsAs per need, such medicine should be selected and applied.As a result, if there is no insight, how will this wisdom come? Medication may be necessary from time to time depending on the cause, such as an infectious cold or joint pain. If suddenly the night of the awakening of the awakening, those causes will be a symptom of the symptoms of the pain, but even if that happens, the symptoms will choose the medicine, because it will not be taken to the medicine. The actual homeopathy is three main support-1. 'Sam: Shamti:'- This formula. 2. The shortest or delicate dimensions. 1. Applied only one medicine at the same time. There are more, but all three are absolutely basic
(২) এক্ষণে 'পীড়ার' প্রকৃত নিদান কি? এই প্রশ্নের উত্তর একটু বিশদভাবে আলোচনা করা যাইতে পারে। মহাত্মা হ্যানিম্যান বহুবার বলিয়াছেন যে, "সোরা"ই সর্ববিধ পীড়ার প্রকৃত কারণ। তিনি আরও বলিয়াছেন যে, তরুণ পীড়ামাত্রই সুপ্ত সোরার সাময়িক উচ্ছ্বাসমাত্র। 'সোরা দোষ' বলিলে, ইহার প্রকৃত অর্থ অনেক সময়ে আমাদের হৃদয়ঙ্গম হয় না। অনেকেই সোরা অর্থে খোস পাঁচড়া বা কোনও প্রকার চর্মরোগ মনে করেন-কিন্তু তাহা সম্পূর্ণ ভ্রম। খোস পাঁচড়া বা কোনও চর্মরোগ সোরা নহে, তবে সোরারূপ কারণের কার্য বা ফল মাত্র, সোরা অর্থে চর্মরোগ নয়। সোরা দোষের একটি বিকাশ-খোস পাঁচড়া বটে। সোরা দোষ-হেতু এবং খোস পাঁচড়া-তাহার ফল মাত্র, খোস পাঁচড়া শরীরের সোরা দোষের অবস্থিতি জ্ঞাপন করে, অর্থাৎ কাহারও অঙ্গে খোস পাঁচড়া হইয়াছে দেখিলে জানিতে হইবে যে, তাহার শরীর সোরাদোষযুক্ত। যাহার শরীরে সোরা দোষ নাই, তাহার খোস পাঁচড়া হওয়া অসম্ভব। চর্মরোগ বা খোস পাঁচড়ার পূর্বাবস্থাই সোরা-আগে সোরা, পরে খোস পাঁচড়া। কাজেই সোরা অর্থে খোস পাঁচড়া বা কোনও চর্মরোগ বলিলে ভুল হইবে। এক্ষণে জিজ্ঞাস্য হইতে পারে, সোরা কি?-সোরা মানবশরীরের একটি অবস্থা মাত্র। মানব যতদিন বিশ্ব নিয়ন্তার নিয়মাবলী প্রতিপালন করিয়া জীবন যাপন করিতেছিল, ততদিন সোরা দোষ ছিল না। যতদিন মানবের চিন্তা, অনুভূতি, মনন ও কার্যসমূহের শৃঙ্খলা ছিল-ততদিন কোনও গোলোযোগ ছিল না। যখন হইতে মানব পরস্পরের প্রতি হিংসাপরবশ হইয়া ও সত্য বা প্রকৃত পথ হইতে স্খলিত হইয়া কু-চিন্তা, কু-ইচ্ছা ও কু-মনন আরম্ভ করিল তখন হইতে মানবের শরীর-যন্ত্রের মধ্যে একটা বিশৃঙ্খলা আরম্ভ হইল। এই বিশৃঙ্খলা সোরার পূর্বরূপ বলা যাইতে পারে। এই বিশৃঙ্খলা হইতে সোরা দোষ ও সোরা দোষ হইতেই আমরা বাহ্য প্রকৃতির দাস হইয়াছি ও আমাদের শরীর নানা পীড়ার আকরভূমি হইয়াছে। যতদিন মানব ন্যায় ও সঙ্গতভাবে জীবন যাপন করিতেছিল, ততদিন তাহার রোগ-প্রবণতা আদৌ ছিল না, কেননা মানবের সত্যপথে থাকিবার জন্যই সৃজন। যখন স্রষ্টার নিয়মাবলী উল্লঙ্ঘন করিয়া, মানব পরস্পরের প্রতি মিথ্যা বা অলীক ব্যবহার-অর্থাৎ অ-সত্যসঙ্গত, অ-ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার আরম্ভ করিল, তখন হইতে তাহার নিয়ন্তার সৃষ্ট ও অভিপ্রেত-নির্মল, স্বচ্ছ, সত্য ও সুশৃঙ্খল অবস্থার পরিবর্তে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হইল। ঐ বিশৃঙ্খলা বা বিপর্যয়যুক্ত অবস্থা হইতেই সোরার সৃষ্টি। যে বিশৃঙ্খলা বা বিপর্যয়ের কথা উক্ত হইল, তাহা তখনও মানসিক 'অবস্থা মাত্র-তখনও কার্য বিপর্যয় ঘটে নাই, অবস্থা বিপর্যয় ঘটিয়াছে মাত্র। এইঅবস্থা বিপর্যয় না ঘটিঞ্জা, সোরার আবির্ভাব অসম্ভব হইত। মানসিক বিশৃঙ্খলা ঘটিয়াছে, ভবিষ্যতে কার্যে বিশৃঙ্খলা ঘটিবার কারণ মাত্র সৃষ্টি হইয়াছে, এখনও ঘটে নাই। আগেই মনোদুষ্টি-পরে কার্যদুষ্টিও আসিবে, তবে এখনও আসে নাই। কারণের সৃষ্টি হইলে-কার্য আসিবেই। অতএব দেখা গেল যে, প্রথমে অসৎ চিন্তা মনন। একটু সামান্য প্রণিধান করিয়া দেখিলে বেশ জানিতে পারা যাইবে যে, মনের এই প্রকার অবস্থা যাহাতে অন্যের প্রতি অ-সত্যচিন্তা এবং অ-সত্যমনন সম্ভব হয়, তাহা এক প্রকার মানসিক বা আভ্যন্তরিন 'কুণ্ডয়ণ' মাত্র। এই 'কুওয়ণ' অবস্থা হইতে মানবের রোগ প্রবণতার প্রথম সোপান স্থাপিত হইল। আগে অসত্য চিন্তা ও তৎসঙ্গেই অসত্যমনন-পরে ঐ চিন্তা ও মনন হইতে তাহাদের অনুরূপ পরিবর্তন বাহিরে সংঘটিত হইল। যেরূপ চিন্তা ও মনন ভিতরে-ঠিক তদনরূপ পরিবর্তন বাহিরে। ভিতরের কুওয়ণ অনুসারে বাহিরেও তদনরূপ কুওয়ণ আরম্ভ হইল-কেননা বাহ্য, কেবল মাত্র অভ্যন্তরেরই প্রতিচ্ছায়া। ভিতরের অবস্থা বাহিরে বিকশিত হইল। এক্ষণে উক্ত আভ্যন্তরিক অবস্থাবিপর্যয়ের অনুরূপ দৈহিক পরিবর্তনের নাম সোরা, এই দৈহিক পরিবর্তনই সোরার বাহ্যবিকশিত রূপ। সোরার এই অবস্থাতে মনুষ্য রোগ-প্রবণ হইয়া উঠিল-অর্থাৎ তাহার দেহের এরূপ একটি অবস্থা আসিল, যাহাতে সে. বাহ্য প্রকৃতির অধীন হইয়া রোগশক্তির দাস হইয়া উঠিল। রোগশক্তিকে বাধা দিবার শক্তি হারাইয়া ফেলিল।
পূর্বেই উক্ত হইয়াছে যে, অসত্য চিন্তা ও অসত্য মনন এক প্রকার আভ্যন্তরিক কুন্ডয়ণ-ও এই আভ্যন্তরিক কুন্ডয়ণের প্রতিরূপ বাহ্যিক কুণ্ডয়ণই সোরার আদি ও বিকশিত মূর্তি। বাস্তবিক সোরার প্রথম আবির্ভাব ইহা মানবদেহের কোনও অংশে কুন্ডয়ণরূপে দেখা দেয় ও তৎসঙ্গে কুওয়ণের ফল-স্বরূপ রসপূর্ণ উদ্ভেদ আসিয়া উপস্থিত হয়। এই জন্যই সোরা অর্থে অনেকে 'খোস চুলকানি' মনে করেন। বস্তুতঃ তাহা নয়, ইহা সোরার ফলমাত্র বা কার্যমাত্র-ইহা সোরা নহে। সোরা না থাকিলে খোস চুলকানি হইতে পারে না। এমন কুন্ডয়ণই সোরা দোষের বর্তমানতার প্রকৃষ্ট প্রমাণ-কুণ্ডয়ণ থাকিলেই সোরা দোষ নিশ্চয়ই আছে- এ বিষয়ে সন্দেহ নাই-পারদ বিষ হেতু উদ্ভেদে কুওয়ণ থাকে না। যাহা হউক, সোরা বলিলে কি বুঝিতে হইবে, তাহা বলা হইল-সোরা শরীরযন্ত্রের এক প্রকার দোষ বা দুষ্ট ধাতু, যাহা মানবের সকল প্রকার রোগের আদি ও মূলীভূত কারণ-যাহা থাকিলে মানবের রোগ প্রবণতা থাকে। আবার এই সোরা দোষ বংশানুক্রমিক চলিয়া আসিতেছে এবং ক্রমেই ইহার প্রভাব বৃদ্ধিই পাইতেছে। . শরীরের আরও দুইটি দোষ আছে, তাহাদের নাম মেহ ও উপদংশ দোষ- ঐগুলির বিশদ ব্যাখ্যা পরে প্রদত্ত হইবে। তবে এই পর্যন্ত বলা উচিত যে, ইহারাওসোরা বর্তমান না থাকিলে মনুষ্যদেহকে আক্রমণ করিতে পারে না। যাহাদের সোরা দোষ নাই, তাহাদের মেহ বা উপদংশ দোষ আসিতে পারে না। আর এক কথা, ইহা মনুষ্যের দুষ্কৃতি বা পাপ কার্য হইতে আসে, অর্থাৎ ইহা পাপ কার্যের ফল। যেহেতু অগ্রেই পাপচিন্তা, কু-মনন, পরে সেই চিন্তা ও মনন অনুসারে কার্য, সুতরাং সেই কু-কার্যরূপ হেতুটি আসিবার পূর্বে সোরা দোষ অবশ্যই থাকা চাই- নতুবা ইহাদের আক্রমণ অসম্ভব। মোটকথা-সোরা অসৎ চিন্তা ও অসৎ মননের ফল-আর মেহ এবং উপদংশ অসৎ কার্যের ফল।
মানবের এই সোরাদোষ নিজেই নানা পীড়ার কারণ, আবার ইহা নানাভাবে মিশ্রণ বা মিলন দোষে বহুবিধ করালমূর্তিতে ধ্বংসকার্যের সহায়তা করিতেছে- সেগুলি একে একে সংক্ষেপে বর্ণিত হইতেছে। ১। এলোপ্যাথিক চিকিৎসাতে মানবের এই সোরাদোষকে আরোগ্য না করিয়া কেবল তেজস্কর ভেষজ-শক্তির দ্বারা ক্রমাগত চাপা দিয়া আসিতেছে। আশু উপকার দর্শাইবার উদ্দেশ্যে বহিঃস্থ উদ্ভেদাদির উপর উগ্রবীর্য প্রলেপাদি প্রয়োগ দ্বারা সোরাকে অন্তর্মুখ করিয়া মানবদেহস্থ যন্ত্রসকলকে পীড়াগ্রস্ত করিতেছে। কোনও বালকের খোস চুলকানি হইয়াছে, তাহার উপর বাহ্য ঔষধের ব্যবহার করিয়া খোস, চুলকানির সত্বর বিলুপ্ত বা দৃষ্টিবহির্ভূত হইয়া থাকে বটে, কিন্তু আরোগ্য ত হয়ই না, উপরন্তু উক্ত প্রলেপের গুণে খোস চুলকানিগুলি (যাহা সোরার বহির্বিকাশ মাত্র) দৃষ্টির অন্তরালে গিয়া ঐ বালকটির আভ্যন্তরিক যন্ত্রসকলকে ভয়ানক ভাবে আক্রমণ করিয়া থাকে। বালকের হয়ত স্নায়ুমন্ডলীর বিকৃতি উৎপাদন করিয়া ভয়ানক শিরঃপীড়া আনিল। তখন এলোপ্যাথিক চিকিৎসক মহাশয় বলিলেন, 'সে রোগ সারিয়াছে-এটি একটি নূতন রোগ।' তিনি এই 'নূতন' রোগের 'চিকিৎসা' আরম্ভ করিয়া সেই পীড়া চাপা দিবার পথে চলিলেন- উগ্রবীর্য ভেষজ যথা, অহিফেন ইত্যাদির দ্বারা যাহাতে রোগীর শিরঃপীড়ার যাতনা উপলব্ধি করিবার ক্ষমতা না থাকে, তিনি তাহাই করিলেন-ক্রমে হৃৎপিণ্ড আক্রান্ত হইল। এইরূপে একের পর বা একের সঙ্গে সঙ্গেই আরও এক এক করিয়া নানা বিভ্রাট ঘটিতে লাগিল। কাজেই দেখা যায় যে, এক সোরা দোষকে না সারাইয়া চাপা দিবার ফলে কতকগুলি নূতন নূতন রোগের সৃষ্টি করা হয়। আমি যে কত রোগীর ঐ প্রকার চর্মরোগের ইতিহাস পাইয়া, লক্ষণবিশেষে সালফার, সোরিনাম, মেজেরিয়াম, নেট্রাম মিউর, সিপিয়া ইত্যাদির মধ্যে যাহার সহিত লক্ষণসমষ্টির মিল হইয়াছে, সেই ঔষধ দ্বারা কত দূরারোগ্য পুরাতন রোগ আরাম করিয়াছি, তাহা গণনার অতীত। মহামতি অ্যালেন, কেন্ট, ফ্যারিংটন প্রভৃতি সকলেই তাঁহাদের ঐরূপ অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন এবং মহাত্মা হ্যানিম্যানের প্রদর্শিত প্রকৃত হোমিওপ্যাথিক পথাবলম্বী, সকল চিকিৎসকই তাঁহাদের নিজ নিজ চিকিৎসাতে ঐরূপ অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছেন। নিদানে যে সকল রোগ নানা নামেপৃথক পৃথকভাবে অভিহিত আছে, তাহা সকলই এক সোরাবৃক্ষের ফল মাত্র। এই প্রকার চিকিৎসা প্রকৃতপক্ষে চিকিৎসা নহে-কেবল চাপা দিবার বিধানমাত্র এবং চাপা দিতে গিয়া এলোপ্যাথি ভেষজের ক্রিয়ার গুণে ও মিলনে সুখসাধ্য পীড়া দুরারোগ্য ও অসাধ্য হয় মাত্র। ২। সোরা দোষ আবার মেহ উপদংশের সহিত মিলিত হইয়া যে কত সর্বনাশ সাধন করিতেছে-তাহা বর্ণনার অতীত। যখন মানবদেহ কু-কার্যের ফলে প্রথমে মেহ বা উপদংশ দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন প্রকৃতভাবে হ্যোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা হইলে, উহারা প্রথমেই আরোগ্য হইতে পারে, কিন্তু তাহা না হইয়া এলোপ্যাথিক ইঞ্জেকশন ইত্যাদির দ্বারা রোগশক্তিকে অন্তর্মুখ করিয়া তোলে ও নোরা দোষের সহিত মিলিত হইয়া দেহটিকে নানা পীড়ার আধার করিয়া ফেলে। বাত, ক্ষয়কাশ ইত্যাদি দুরারোগ্য বা অসাধ্য রোগ সকল এই মিলনেরই ফল মাত্র। ৩। আমাদের দ্বারা ঔষধ প্রয়োগ হইলেই যে তাহা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা হইবে, বা হোমিওপ্যাথিক বাক্স হইতে ঔষধ দিলেই যে তাহা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা হইবে তাহা নহে-কিন্তু সাধারণের ধারণা তাহাই। হোমিওপ্যাথিক মূলমন্ত্র অনুসারে প্রদত্ত ঔষধ দ্বারা চিকিৎসা না হইলে, তাহাকে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা বলা ভুল ও অন্যায়। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার মূলমন্ত্র তিনটি যথা- (১) সদৃশ লক্ষণানুসারে ঔষধ নির্বাচন। (২) এক সময়ে একটি মাত্র ঔষধ প্রয়োগ। (৩) সূক্ষ্মতম মাত্রায় ঔষধ প্রয়োগ। আমি যদি এই তিনটি মূলমন্ত্র লঙ্ঘন করিয়া আমার নিজের খেয়ালমত ঔষধ নির্বাচন, যথা-মাথা ধরিলেই বেলেডনা, জ্বর হইলেই একোনাইট, সর্দি হইলেই আর্সেনিক প্রয়োগ করি, অথবা ২টি বা ৩টি ঔষধ এককালে প্রয়োগ করি বা অযথাভাবে নিম্নতম শক্তির ঔষধ দিই, তবে আমার চিকিৎসা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা হইল না বা তাহার দ্বারা রোগীর কোনও লক্ষণের বা ২।৩টি লক্ষণ সমষ্টির কিছুকালের জন্য অন্তর্ধান হইলেও তাহাকে 'আরোগ্য' বলা যাইতে পারে না। একোনাইট দিলে হয়ত সঙ্গে সঙ্গে গাত্রদাহ কমিয়া যাইতে পারে, কিন্তু তাহাকে 'আরাম' বলা যাইতে পারে না। কেননা একোনাইটের এরূপ প্রয়োগে কেবলমাত্র হৃৎপিণ্ডের উপর একটা অযথা শক্তি প্রয়োগ দ্বারা উক্ত যন্ত্রের অবসাদ ঘটাইয়া তাপ কমাইল, কিন্তু প্রতিক্রিয়াতে সর্বনাশ ঘটে। নিউমোনিয়াতে ভিরেট্রাম ভিরিডি অসমলক্ষণে প্রয়োগ করিয়া এক সময়ে যে কি সর্বনাশ ঘটিয়াছে, তাহা বিজ্ঞ হোমিওপ্যাথ মাত্রেই জ্ঞাত আছেন। অনেক হোমিওপ্যাথিক নামধারী চিকিৎসক পর্যায়ক্রমে ২।৩টি ঔষধ প্রয়োগ করেন, কেহ বা ঔষধের কেবল ১দ, ২দ, ৩দ শক্তি ব্যবহার করেন। এই ভাবের চিকিৎসাতেও রোগ আরোগ্য না হইয়া চাপা পড়ে ও এলোপ্যাথিক চিকিৎসা অপেক্ষা কোনও প্রকারের ভাল ফল আশা করা যায় না। যে চিকিৎসক প্লীহা বৃদ্ধি শুনিলে সিয়ানোখাস মাদার টিং বা ১দ ২।৩ বার করিয়া ২।১ মাস ব্যবহারকরাইয়া প্লীহা কমাইবার আশা করেন, হাঁপানি হইয়াছে জানিলেই ব্লাটা ওরিয়েনটেলিস হাঁপের অবস্থায় দিয়া থাকেন, তাহাদিগকে হোমিওপ্যাথ নাম দেওয়া বিড়ম্বনা মাত্র। এই প্রকার চিকিৎসাতেও সোরা দোষ আরও বৃদ্ধি পাইয়া ও রোগশক্তিকে অন্তর্মুখ করিয়া রোগটিকে দুরারোগ্য করে ও নানা নামের নানা রোগ সৃষ্টি করে। যদি কেহ জিজ্ঞাসা করেন বা আপত্তি করেন যে, সোরাই বিবিধ রোগের কারণ ও এলোপ্যাথিক বা উপরোক্ত প্রকার অদ্ভুত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ফলে যে অন্য রোগের সৃষ্টি হয় বলিয়া বলা হইল-এ কথার প্রমাণ কি? কিরূপে বৈজ্ঞানিক ভাবে জানা যাইতে পারে যে উক্ত কথা প্রামাণিক? হইতে পারে-একথা চিকিৎসক বিশেষের প্রলাপোক্তি? অতএব ইহার প্রমাণস্বরূপও কথিত নিম্নলিখিত পংক্তিগুলি বিশেষভাবে প্রণিধান করিলেই বিষয়টি জটিল হইলেও বেশ হৃদয়ঙ্গম হইবে, আশা করি।
At the same time, as a result of the good, there is a juicy difference. That's why many people think 'Khos Chulkani' in the sense of Sora. In fact, it is not, it is the result of Sora or its effect - it is not Sora. If there is no psoriasis, the scab cannot be itchy. Such kundayana is the clear proof of the presence of Sora Dosha - if kundayana is present, there is no doubt about it - there is no kuwana due to mercury poisoning. Whatever the case, what to say to say, it is said that-a type of fault or vicious metal, which is the origin and root cause of all human diseases-which is the cause of human disease. Again, the fault of the Sora is coming to the hereditary and gradually its impact is increasing. . There are two other doshas in the body, namely meha and upadangasha doshas - detailed explanation of which will be given later. However, it should be said that Iharaosora cannot attack the human body if it is not present. Those who have no sora dosha, their meh or upadangsa dosha cannot come. One more thing, it comes from the wrongdoing or sinful actions of man, that is, it is the result of sinful actions. Since first there is a sinful thought, evil thought, then action according to that thought and thought, so before the cause of that evil action comes, Sora dosha must exist - otherwise it is impossible to attack it. In fact, the result of dishonest thought and dishonest mind is the result of the meh and the result of evil deeds.
The cause of the human being itself is the cause of various disorders, and again it is helping the destruction of the various coconuts in various ways of mixing or union- they are briefly described. 1. In allopathic treatment, the human being is constantly being pressed by the herbal herbs without healing this human psalm. In order to show the benefit of the asu, the inward applications of the extremist on the outbreak are inward and the human body is impaired. It is haired by a boy, using the external medicine on it, it is immediately extinct or visible, but not healing, in addition to the quality of the vessel (which is the outbreak of the sore Attackkeeps doingThe boy may produce the distortion of the nerve and bring a terrible headache. Then the allopathic physician said, 'He has cure the disease-it is a new disease. " He began the 'treatment' of this 'new' disease and proceeded to suppress the pain - by means of virulent herbs, such as ahiphen etc., which he did not have the capacity to perceive the pain of the headache - gradually the heart was affected. In this way, one after the other or at the same time, various outages started to happen one by one. Therefore, it can be seen that several new diseases are created as a result of suppressing one Sora Dosha without curing it. It is beyond counting how many patients I have had the history of that type of skin disease, with which the symptoms of sulphur, psorinum, mezerium, natrum mure, sepia etc. are similar, and how many incurable old diseases have been relieved by that medicine. Mahamati Allen, Kent, Farrington, etc., have all recorded their experiences, and the true homeopathic pioneers shown by Mahatma Hahnemann, all physicians have had such experiences in their respective treatments. All the diseases which are called by different names in Nidan, are all the fruits of one Soravriksha. This type of treatment is not really a treatment - it is only a prescription for suppressing and by virtue of the action of the allopathic herbs used to suppress the pleasant pain becomes incurable and incurable. 2. Sora Dosha combined with Meh Upadangsa again, how much destruction is being done - it is beyond descriptionWhen the human body is first affected by meha or stung by evil deeds, they can be cured first by homeopathic treatment, but not by allopathic injections, etc., the disease force is internalized and combined with nora dosha leaves the body in a state of suffering. . All incurable or incurable diseases such as rheumatism, decay etc. are only the result of this union. 3. It is not that if we apply a medicine it will be homeopathic treatment, or if we give medicine from a homeopathic box it will be homeopathic treatment - but that is the general idea. If the medicine given is not treated according to homeopathic principles, it is wrong and unfair to call it homeopathic treatment. There are three principles of homeopathic treatment viz.- (1) Selection of medicines according to similar symptoms. (2) Application of only one drug at a time. (3) Administration of medicine in subtle doses. If I violate these three principles, I apply arsenic in my own way, namely Belladna, arsenic, if you have a fever, or apply 2 or 3 medications at once or give me the lowest energy medicine, but my treatment is homeopathic treatment. No or none of the patient by itSymptoms or 2.A temporary disappearance of the 3 symptoms cannot be called 'cure'. Aconite may relieve the sore throat immediately, but it cannot be called 'relief'. For such an application of Aconite only reduces the heat by an undue force upon the heart, by depressing the apparatus, but destruction in reaction. Only the learned homeopath knows what havoc has been wrought at one time by the careless application of Viretrum Viridi in pneumonia. Many homeopathic practitioners use 2.3 potencies alternately, some use only 1st, 2nd, 3rd potencies. Even in this kind of treatment, the disease is suppressed without being cured and no better results can be expected than allopathic treatment. The physician who hears the enlargement of the spleen is Cyanokhas Mother Ting or 1d 2He hopes to reduce the spleen for 2.5 months for 2 times, asthma has been given asthma, but it is given to Bata Orientellis asthma, it is just a matter of name to the name of the homeopath. In this type of treatment, Sora's fault is further enhanced and inwarding the disease, healing the disease and causes various diseases. If anyone asks or objects that Psoriasis is the cause of various diseases and other diseases that are caused by allopathic or the above type of strange homeopathic treatment what is the proof? How can it be scientifically known that the words are authentic? Maybe - this is the delusion of the doctor? Therefore, as proof of this, the following lines are especially important if the matter is complicated, but hopefully it will be quite heartbreaking.
প্রকৃত হোমিওপ্যাথিক নিয়ম অনুসারে যদি চিকিৎসা করা যায়, তবে এই সত্যগুলি প্রতিভাত হইবে, যথা- (ক) কোনও রোগীর রোগলক্ষণ ও ইতিহাস রেজেষ্ট্রী করিয়া লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিলেন ও দেখিলেন যে রোগী বর্তমান সময় যে রোগলক্ষণ সমষ্টি ভোগ করিতেছে, তাহা ২।১ বৎসর মাত্র হইয়াছে, যথা রোগী হয়ত এখন বৈকালে সামান্য জ্বর, কাশি ও গাত্রদাহ, সময়ে সময়ে শীতবোধ, অক্ষুধা, অরুচি, উদরাময়, ইত্যাদিতে ভুগিতেছে; ২।৩ বৎসর পূর্বে তাহার সবিরাম জ্বর হইত, কুইনাইন ও টনিক খাইয়া তাহা সারে, আরও ৩।৪ বৎসর পূর্বে তাহার পায়ের উপর এক প্রকার চর্মরোগ হয়, তাহাতে বড় কষ্ট পায় এবং কোনও ডাক্তার কোনও মলম দিয়া সারান, ঐ চর্মরোগে অত্যন্ত পূজ ও রস নির্গত হইত ও দুর্গন্ধ বাহির হইত, আরও কিছুদিন পূর্বে তাহার সর্বাঙ্গেই এক প্রকার চুলকানি হইয়াছিল তাহাতে রাত্রে শয়নের পর তাহাকে অস্থির হইতে হইত, এবং যদিও তাহাতে সামান্য রস বা রক্ত ব্যতীত অপর কিছু স্রাব হইত না বটে কিন্তু চুলকানির জন্য বড় কষ্ট হইত ইত্যাদি। ঐ রোগীর ধাতুগত লক্ষণাদি উত্তম করিয়া লইয়া জানিলেন যে, সে ব্যক্তি গরমে থাকিতেই ভালবাসে, ঠাণ্ডা লাগিলেই তাহার কষ্ট বাড়ে ও সর্দি হয়, শিরঃপীড়া হয়, দুধ তাহার আদৌ সহ্য হয় না, মেজাজ বড় খিটখিটে ইত্যাদি। উপরোক্ত রোগলক্ষণসমষ্টি এবং ধাতুগত লক্ষণগুলি একত্র করিয়া স্থির করিলেন যে, আর্সেনিক এলবাম তাহার ঔষধ হইবে, এবং আর্সেনিক উচ্চ শক্তি আপনি দিলেন। এক মাত্রা প্রয়োগ করিবার ২।৩ মাসের মধ্যে আপনি দেখিবেন, তাহার বর্তমান রোগের লক্ষণসমষ্টি অন্তর্হিত হইয়াছে-কিন্তু রোগী আসিয়া বলিবে, 'মহাশয় আমার ২।৩ বৎসর পূর্বে, যে সবিরাম জ্বর হইত, তাহা আবার দেখা দিয়াছে, আপনি আপনার রেজেষ্ট্রী দেখিয়া জানিলেন যে, প্রকৃতই ২।৩ বৎসর পূর্বেতাহার সবিরাম জ্বর হইয়াছিল লেখা আছে। আপনি বুঝিলেন যে ভালই হইয়াছে। এইরূপে আপনি যদি ভালভাবে লক্ষ্য করেন এবং আপনার প্রদত্ত ঔষধের কার্যকে কোনও প্রকার বাধা না দেন, তবে দেখিবেন যে ক্রমেই পূর্ব পূর্ব অবস্থাগুলি একে একে আসিবে, অর্থাৎ যেগুলি অচিকিৎসায় নিরাময় না হইয়া কেবল চাপা পড়িয়াছিল, সেগুলি একে একে আসিবে ও আরোগ্য হইবে এবং সর্বশেষে সোরার আদি বিকাশ স্বরূপ শুল্ক চুলকণা উদয় হইয়া অন্তর্হিত হইবে এবং আপনার রোগী নির্মলভাবে ও প্রকৃত প্রস্তাবে আরোগ্য হইবে। এই প্রকার পূর্ব পূর্ব লক্ষণের ক্রমিক আবির্ভাব ও তিরোভাব হইয়া সোরার আদি মূর্তিতে পৌঁছিলে, আপনার মনে আদৌ সন্দেহ থাকিবে না যে, সোরা 'চাপা দেওয়া' হেতু এত বিভ্রাট ঘটিয়াছিল। এলোপ্যাথিক ডাক্তার মহাশয় ঐ আদি খোসচুলকণার নাম কহিয়াছিলেন-চুলকণা, তাহার পর চর্মরোগকে কাউর, তাহার পর জ্বর হইলে তাহাকে সবিরাম জ্বর, তাহার পর রোগীর বর্তমান অবস্থাকে ক্ষয়রোগ, ইত্যাদি- নানা নাম দিয়াছিলেন। প্রকৃত প্রস্তাবে এক সোরা ভিন্ন কেহ কিছুই নয়। (খ) অনেক সময় রোগীর রোগলক্ষণসমষ্টি, আপনার চিকিৎসায় উপস্থিত কিছুদিনের জন্য অন্তর্হিত হইলেও আপনি দেখিবেন যে, সেগুলি বার বার আসিতেছে, একেবারে নিরাময় হইতেছে না, সে অবস্থায় আপনি সোরাদোষঘ্ন ঔষধ অর্থাৎ সোরাদোষের বিরোধী ঔষধ সকলের মধ্য হইতে লক্ষণানুসারে নির্বাচিত ঔষধ প্রয়োগ না করিলে রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় হইবে না-ইহাতে স্পষ্টই প্রমাণ হইতেছে-সোরাই আরোগ্যের পথে বাধা দিতেছিল।
রোগ ও রোগী হোমিওপ্যাথি ব্যতীত অন্যান্য সকল মতের চিকিৎসানুসারে 'রোগ' চিকিৎসা করিবারই ব্যবস্থা আছে, 'রোগী' যেমনই হউক না কেন। যদি তাহার নিউমোনিয়া হইয়া থাকে, তবে অপর একটি রোগীর নিউমোনিয়াতে যে প্রকার চিকিৎসা হইয়াছে, ইহার নিউমোনিয়াতেও তাহাই কর্তব্য। কেবল রোগীর বয়সভেদে ঔষধের মাত্রায় একটু তারতম্য হইবে এই পর্যন্ত। 'রোগের' নাম যদি পাওয়া গেল, তবে আর চিন্তার কোনও কারণ নাই-বাঁধা ধরা নিয়মবদ্ধ চিকিৎসার প্রণালী আছে, তদনুসারে 'চিকিৎসা' করা অর্থাৎ ঔষধ দিলেই হইল। দুইটি নিউমোনিয়া রোগীর মধ্যে যদি একজন তাহার বুকে পুলটিস চাপাইবামাত্র চিৎকার করিতে থাকে, কেননা সে তাহার দেহে অত্যন্ত জ্বালা অনুভব করিতেছে, এজন্য সে কোনও প্রকার তাপ সহ্য করিতে পারিতেছে না এবং আর একজন গরম পুলটিস দিলে আরাম বোধ করে, কেননা সে সর্বদা শীত অনুভব করিতেছে-এবং এই দুইজন রোগীই যদি একই চিকিৎসকের হাতে থাকে, তাহা হইলেও তিনি উভয়কেই গরম পুলটিসেরই ব্যবস্থা করিবেন-কেননা তিনি বলিবেন, 'পুলটিস ক্য দিলে ভিতরের কফ নরম হইবে কেন?' রোগী দুইটির মধ্যে একজনের তাপাভিলাষ ও আর একজনের শৈত্যাভিলাষ-এই যে ব্যক্তিগত বিভিন্নতা, তাহাতে চিকিৎসকের চিকিৎসা প্রণালীর তারতম্য হইবে না-যেহেতু তিনি 'রোগ' আরোগ্য করিতে চান। বরং তিনি কহিবেন যে, 'যদি পুলটিস লইতে না চায়, তাহ। হইলেও যেন জোর করিয়া দেওয়া হয়। মনে করুন, তিনটি লোকের সবিরাম জ্বর হইতেছে, তাহার মধ্যে একজনের জ্বরটি প্রাতঃকালে ৯।১০ টার সময় কম্প দিয়া আসে, যতক্ষণ জ্বর থাকে দারুণ পিপাসা থাকে এবং ভয়ানক শিরঃপীড়া। আর একজনের জ্বর বৈকাল ৩।৪টার সময় আসে, ভয়ানক হাত পা জ্বালা, কিন্তু পিপাসা আদৌ নাই। এবং তৃতীয় ব্যক্তির জ্বর সন্ধ্যায় আসে, সমস্ত রাত্রি থাকে, অত্যন্ত পিপাসা অথচ একটু একটু জল খায়, এবং অতিশয় অস্থিরতা। ফলতঃ এই তিন জন রোগীর জ্বর হইয়াছে জানিতে পারিলেই হোমিওপ্যাথি ব্যতীত অন্য মতের চিকিৎসকের চিকিৎসা চলিলে এবং জ্বর যখন মগ্ন হইতেছে, তখন তিনজনকেই এলোপ্যাথিক মতের চিকিৎসায় কুইনাইন দেওয়া হইবে। কেননা তিনজনেরই ত জ্বর, কাজেই 'জ্বরের' প্রতিকার কুইনাইনের দ্বারা হইবে। উক্ত তিনজন রোগীর ব্যক্তিগত লক্ষণের তারতম্যের প্রতি লক্ষ্য রাখিবার প্রয়োজন নাই, কেননা 'জ্বরই' চিকিৎসার বিষয়। আরও উদাহরণ দ্বারা বেশ বুঝাইতে পারা যায় যে. রোগের প্রতিকারই চিকিৎসকের একমাত্র লক্ষ্য, রোগীর প্রতি আদৌ লক্ষ্য নাই।এই মতের চিকিৎসক যদি না জানিতে পারিলেন যে, রোগীর কি রোগ হইয়াছে, তবেই সর্বনাশ, তিনি বলিলেন 'রোগের' ডায়গনসিস চাই, তাহা না হইলে চিকিৎসাই চলিতে পারে না। যদি কোনও চিকিৎসক আসিয়া রোগটি ডায়গনসিস করিতে না পারিলেন বা কিছু সন্দেহবান হইলেন, তখনই অন্য ডাক্তার দুই একজনকে আনাইয়া 'রোগটি' কি আগে নিরাকরণ করিবার বিশেষভাবে চেষ্টা হইবে, কেননা 'রোগ' ঠিক করিতে না পারিলে চিকিৎসাই অসম্ভব। আবার যদি ৩।৪ জন চিকিৎসকের মধ্যে নানা মত হইল, তবে ত আরও বিপদ, ভয়ানক বিভ্রাট, কি রোগ তাহা ঠিক হইতেছে না-সকলেই মাথা কুটাকুটি করিতেছেন, অথচ রোগী হয়ত ক্রমেই মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হইতেছে, তাহা এই চিকিৎসক 'মহাশয়দের গভীর গবেষণাবাহুল্য হেতু লক্ষ্য করিবার অবসর নাই। আমার বেশ মনে আছে ১৯১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষে, মানভূম জেলার বরাবাজার নামক স্থানে শ্রীযুক্ত চণ্ডীচরণ মোদক মহাশয়ের একটি মোকদ্দমায় সালিশী করিতে গিয়াছিলাম, গিয়া দেখি যে, তাহার গৃহস্থ বিব্রত, কেননা ৮ বৎসর বয়স্ক তাঁহার একটি পুত্রের প্রবল জ্বর ও ৫০। ৬০ বার করিয়া দুর্গন্ধ বাহ্যে, পিপাসা, অস্থিরতা ইত্যাদি হওয়ায় বড় কষ্ট পাইতেছে। চন্ডীবাবু বেশ ধনাঢ্য ব্যক্তি, নানা চিকিৎসক আনাইয়াছেন, তবে তাহারা ঠিক করিতে পারিতেছেন না যে, কোনটি 'স্বাধীন' রোগ-অভিসারটি জ্বরের কারণ, কি জ্বরটি অতিসারের কারণ, এই সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ঔষধ প্রয়োগ হইতেছে না, এদিকে রোগীও 'যায় যায়' হইয়া উঠিয়াছে। আমার সঙ্গে একজন বৃদ্ধ খ্যাতনামা উকিল ছিলেন, তিনি চণ্ডীবাবুকে বলিলেন-'তোমার চিকিৎসকগণ ত এই অবস্থায় ঔষধ দিতে পারিতেছেন না-আমি বলি, ইতিমধ্যে আমাদের নীলমণিবাবু ২।১ ডোজ ঔষধ দিন-তাহা হইলেই আর ঐ প্রশ্নের সমাধানের তত প্রয়োজন হইবে না।' তিনি ও তাঁহার মক্কেল চণ্ডীবাবু আমাকে অনুরোধ করায় আমি আর্সেনিক ৩০-২।৩ মাত্রাতেই সেই রোগীকে আরাম করি, ২৪ ঘন্টার মধ্যে রোগী সারিল-এদিকে গভীর প্রশ্নের সমাধান হইল কিনা আমি সংবাদ লই নাই, কেননা রোগী একটু সারিতে আরম্ভ করিবামাত্র আমরা সালিশী কার্যে মনোযোগ দিয়াছিলাম। যাহা হউক, মোট কথা, আমরা (অর্থাৎ হোমিওপ্যাথি) ব্যতীত সকলেই রোগের ডায়গনসিস করিতে ব্যস্ত, কেননা রোগ স্থির না হইলে তাহার চিকিৎসাই হইতে পারে না।আমাদের তাহা নয়-আমাদের রোগীই সর্বস্ব, রোগ কি, তাহা আমাদের জানা অসম্ভব, কেননা মনুষ্যজ্ঞান ততদূর পৌঁছিতে পারে না। 'রোগীর' শারীরিক ও মানসিক লক্ষণগুলির দ্বারা আমরা বুঝিতে পারি যে, মনুষ্যটি সুস্থ নয়, সে অসুস্থ এবং আমরা যদি সেই 'রোগী'টিকে সম্পূর্ণ আরাম করিবার প্রয়াস পাই-তাহা হইলে তাহার রোগ লক্ষণ আপনিই সারিয়া যায়। এ কথা বলা যত সহজ, বোঝাতত সহজ নয়, কাজেই একটু বিস্তৃতভাবে লেখা আবশ্যক। তাহা ছাড়া এ সকল বিষয় বড়ই দুর্বোধ্য, কাজেই উদাহরণাদির দ্বারা প্রথমে একটু পরিষ্কার করিয়া পরে মূলতত্ত্ব সকল বর্ণনা করিলে বোধ হয় ভাল হইবে। অদ্য এক ব্যক্তি আপনার নিকট কহিল-'মহাশয় আমি কোষ্ঠবন্ধের জন্য বড় কষ্ট পাইতেছি।' আরও কহিল- 'আমার এই কোষ্ঠবদ্ধ ৮।৯ বৎসর হইয়াছে, আমি অনেক চিকিৎসককে দেখাইয়াছি তাঁহারা মধ্যে মধ্যে জোলাপ লইতে বলে ও বলেন তোমার লিভারের রোগ হইয়াছে,' কিন্তু অনেকেই আমার লিভার পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছেন ও কহিয়াছেন যে, বিশেষ কিছু রোগ বলিয়া মনে হয় না-তবে মধ্যে মধ্যে জোলাপ লওয়া ছাড়া আর বিশেষ চিকিৎসা কেহ উপদেশ দেন নাই'। এক্ষণে দেখা গেল যে, ঐ সকল চিকিৎসকদিগের মতে তাহার এখনও কোনও রোগ হয় নাই, যদি কিছুদিন পরে তাহার লিভারটি বড় ও শক্ত দেখা যায়, তবে তাঁহারা কহিবেন যে, 'হাঁ রোগ হইয়াছে বঁটে, ইহাকে যকৃত বিবৃদ্ধি বলে।' যতক্ষণ রোগী কেবলমাত্র, অসুবিধা ও কষ্ট বা অসুস্থতা' মাত্র অনুভব করিতে থাকে, ততক্ষণ তাহার কোনও অসুখ হইয়াছে বলিয়া স্বীকার করেন না যখন একটা এমন কিছু হইয়া উঠে যে, হাতে ঠেকে, স্পর্শ করিয়া দেখিবার মত হয়, তখন বলেন অমুক, 'রোগ' হইয়াছে। কোনও স্ত্রীলোকের হয়ত ৬।৮ মাস ধরিয়া তেলপেটে মধ্যে মধ্যে যাতনা হইতেছিল তাঁহারা বলিলেন 'ও কিছু নয়।' অথবা যাহাতে ২।১ বার বাহ্যে হয়, এমন কোনও জোলাপ দিয়া থাকেন-পরে হয়ত একটি স্থানে যখন অর্বুদ আকারে স্পর্শযোগ্য কিছু হইয়া উঠিল, তখন বলিলেন 'টিউমার' হইয়াছে, অস্ত্র করিতে হইবে। কোনও ব্যক্তির অনেক দিন হইতেই এইরূপ হইয়াছে যে, সে সামান্য ঠান্ডাও সহ্য করিতে পারে না, একটু ঠাণ্ডা বাতাস লাগিলে, মধ্যে মধ্যে সর্দি হইতেছিল-সে অবস্থায় চিকিৎসকেরা কহিবেন-'ও কিছুই নয়' অথবা 'একটু সাবধানে থাকিবেন, যেন ঠান্ডা না লাগে।' অন্য এক ব্যক্তির তাহার অপেক্ষা অধিক ঠাণ্ডা লাগাইলেও কেন সর্দি হয় না, আর উহারই বা হয় কেন তাহার বিষয় তাঁহারা কিছু অনুসন্ধান বা নিরাকরণ করিবেন না বা কর্তব্য বলিয়াও মনে করিবেন না, পরে যখন ৩০ ১৩২ বৎসর বয়সে তাহার দারুণ অবস্থা আসিয়া পৌছিল, তখন বলিলেন, 'ঘাইসিস' হইয়াছে, ইহার আর কি করিব, এই রোগের নাম যক্ষ্মা রোগ, ঠান্ডা লাগাইও না, আর কডলিভার অয়েল খাও এবং ট্রেপটোমাইসিন ইঞ্জেকশন নাও ইত্যাদি।' অর্থাৎ নাসিকা, চক্ষু, কর্ণ, জিহ্বা ও ত্বকের দ্বারা অনুভব করিবার যোগ্য হইলে, তবে একটা 'রোগ' বিশেষের নামকরণ করিয়া অমুক ডাক্তার এই 'রোগে' এই চিকিৎসা করিয়াছেন, অতএব তাহাই কর্তব্য বলিয়া তাঁহারা কহেন।
আপনি হোমিওপ্যাথ, যদি প্রকৃত প্রস্তাবে হোমিওপ্যাথ হন, তবে আপনি জানিবেন যে, যে যক্ষ্মারোগে আজ একজন মানবলীলা সংবরণ করিতেছে, সেঅনেকদিন হইতে 'রোগী': যখন হইতে তাহার সামান্য ঠাকরাও অসহ্য বোধ হইতে আরম্ভ করে ও সামান্য ঠাণ্ডাতেই সর্দিকাশি হইতে থাকে, তখন হইতে এমন কি তাহারও বহু পূর্ব হইতেই সে 'রোগী'। তখন সে রোগীকে চিকিৎসা করিলে, তাহার এখন এই দশা আদৌ ঘটিত না। আজ যাহার, 'রিউমাধ হইয়াছে বলিয়া নির্দেশ হইতেছে, তাহার বহুদিন পূর্ব হইতেই চিকিৎনা কর্তা ছিল। 'রোগীর' চিকিৎসা হইলে জীবনীশক্তি সুক্ষ্মভাবে স্বাভাবিক গঠনকার্য ক্ষতিপূরণ কার্য অবাধে চালাইতে পারিত, তাহা না হওয়ায়, যেখানে ক্ষতিপূল দা সুগঠন করা হইত, সেখানে তাহা না করিতে পারিয়া কুগঠন বা অগঠন করিয়া স্বর্গন্ধাদির নির্মাণ অর্থাৎ অপনির্মাণ বা কুনির্মাণ করিতে বাধ্য হইয়াছে। কাছেই অর্থাযাহাকে 'রোগ' বলিয়া অন্যান্য চিকিৎসকগণ নির্দেশ করিতেছেন তাহা 'রোগ নহে, 'রোগের' ফল মাত্র। শরীরস্থ রস, রক্ত, মাংস, যেদ, অস্থি, মজ্জা ও শুক্র এই ধাতুদিগের যখন এমন একটা পরিবর্তন ঘটে যে, তাহা চিকিৎসকদিগের ইন্দ্রিয়-গোচর হয়, ওখনই কেবল তাঁহারা 'রোগ' হইয়াছে বলেন, কিন্তু ঐ সরল পরিবর্তন ঘটিবার পূর্বে, বহুপূর্ব হইতে তাহার 'রোগ' হওয়ায় তাহারই ফলস্বরূপে ঐ সকল পরিবর্তন ঘটিয়া থাকে, ইহা তাঁহাদের ধারণার বহির্ভূত বা চিন্তার অযোগ্য, কাজেই চিকিৎসার অবিষয়ীভূত। ব্যক্তিবিশেষের কেন বা কি হেতু ঐ সকল পরিবর্তন ঘটে, অন্য লোকেরই বা ডাহা ঘটে না কেন-এ সকল চিন্তা তাহাদের মনে স্থান পায় না। আপনি যদি প্রকৃত হোমিওপ্যাথ হন, তবে আপনি বুঝিতে পারিবেন যে, একটি পীড়া বলিলে মনুষ্যটি পীড়িত বলিতে হইবে, তাহার দেহ ও দেহস্থ কোনও যন্ত্রবিশেষ পীড়িত একথা সম্পূর্ণ ভুল। 'মনুষ্যটি' পীড়িত হওয়ায় তাহার ফলস্বরূপে তাহার যকৃতে, তাহার হৃদযন্ত্রে বা তাহার অস্ত্রে রোগটির 'বিকাশ' হইয়াছে মাত্র। ফলতঃ ঐরূপ বিকাশ হইবার বহু পূর্ব হইতেই মনুষ্যটি পীড়িত এবং তদবস্থায় তাহাকে আরোগ্য করিলে, আর 'ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য' হইয়া পীড়াটি 'বিকশিত' বা 'পরিণত' হইতে পারিত না। সর্বদা আপনার হৃদয়ে এই কথাটি বদ্ধমূল থাকা চাই যে, যে মনুষ্যটি পীড়িত, তাহার শরীরস্থ যন্ত্র বা ধাতু পীড়িত নহে, পীড়াযুক্ত যন্ত্রটি পীড়ার বিকাশভূমি মাত্র এবং যান্ত্রিক পরিবর্তনের পূর্বেই 'পীড়িত' ব্যক্তি প্রকৃতভাবে চিকিৎসিত হইলে, আরোগ্য হইতে পারিত এবং তাহা হইলে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পরিবর্তন ঘটিত না। বর্তমান সময়ে যাহাকে পীড়া বলিয়া অন্যান্য চিকিৎসকগণ কহিতেছেন-সেই পীড়াটি জ্বলন্ত অক্ষরে সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে যে, বহু পূর্ব হইতেই 'মনুষ্যটি' পীড়িত। যতদিন ঐ সকল চিকিৎসক 'ডায়গনসিস' না হইলে চিকিৎসার উপায় নাই বলিয়া কালক্ষয় করিয়াছেন, তখন হইতে প্রকৃত পীড়ার অচিকিৎসার ফলস্বরূপ যন্ত্রাদিতে বিকৃতি উপস্থিত হইয়াছে। এইরূপ অতিরিক্ত কঠিন আকার ধারণ না করা পর্যন্ত এই সকল চিকিৎসার বিষয় নহে, ইহাই এলোপ্যাথের ধারণা। কেননাযখন কেবল মনুষ্যটি পীড়িত, এখনও ফলস্বরূপ তাহার দেহস্থ যন্ত্রাদি বা ধাতুবিশেষ ইন্দ্রিয় গোচরভাবে কিছুই বিকাশ প্রাপ্ত হয় নাই, তখন 'ডায়গনসিস' হইতে পারে না-অতএব তাহার প্রতিকারও অসম্ভব। আমরা বেশ বুঝিলাম যে, রোগীই' চিকিৎসার বিষয়; যাহাকে লোকে 'রোগ' বলে তাহা 'রোগ' নহে, 'রোগের' ফলমাত্র এবং এই ফলস্বরূপ যে রোগ, তাহা চিকিৎসার বিষয় নহে। প্রকৃত প্রস্তাবে চিকিৎসার বিষয়, পীড়িত দেহ বা যন্ত্রবিশেষ নহে-প্রকৃত চিকিৎসার বিষয় 'রোগী'। এই রোগীকে তাহার বিশৃঙ্খল অবস্থা হইতে সুশৃঙ্খল অবস্থায় আনাই চিকিৎসা এবং আনিতে পারিলে উক্ত ফলস্বরূপ 'রোগ' যাহাকে লোকে চিকিৎসার প্রকৃত বিষয় বলে, তাহা আপনিই সারিবে, পূর্বেকার সুশৃঙ্খলা স্বাভাবিকভাবে পুনঃপ্রাপ্ত হইয়া জীবনীশক্তি প্রকৃত গঠন, সুগঠন ও ক্ষতিপূরণ কার্য নিয়মিতভাবে করিতে থাকিবে এবং রোগীও সুস্থ হইবে।
এক্ষণে 'রোগী' কে? এই বিষয়ে একটু পরিষ্কার করিয়া আলোচনা করা কর্তব্য। আমরা কহিয়াছি যে, 'মনুষ্য' নিজে রোগী, তাহার দেহ বা যন্ত্রাদি কেহ পীড়িত নয়। মনুষ্যের কোন অংশকে তবে রোগী বলা হইতেছে? যদি তাহার দেহ ও যন্ত্রাদিকে পীড়িত বলিতে না পারা যায়, তবে কোন্ অংশ রোগী? 'মনুষ্য' বলিলে আমরা কি বুঝিব। মনুষ্য বলিলে, আমরা তাঁহার দেহাদি বা ভিতরের যন্ত্রাদিকে বুঝি ন্য-তাহার দেহ কেবলমাত্র তাহার আবাসস্থল বলিতে হইবে। দেহ যন্ত্রাদি তাহার অধিকারের জিনিস, আমরা বলিয়া থাকি, আমার দেহ, আমার যকৃৎ, আমার হৃৎপিণ্ড ইত্যাদি, অর্থাৎ আমি স্বতন্ত্র এবং দেহাদি বা দেহাভ্যন্তরস্থ যন্ত্রাদি আমার অধিকারস্থ দ্রব্য। আমরা যেমন 'আমার বাড়ী, আমার বাগান' ইত্যাদি কহিয়া থাকি। সেইরূপ 'আমার দেহ', আমার উদর, আমার প্লীহা ইত্যাদি বাক্য প্রয়োগ করিয়া থাকি, অতএব এই সকল দ্রব্য হইতে 'আমি' স্বতন্ত্র। আমি যখন কহি যে, 'আমি পীড়িত' তখন জানিতে হইবে যে, 'আমি' কেই আমরা 'মনুষ্য' বলিয়া বুঝি। অনেক সময় অনেক 'পীড়িত' ব্যক্তি আপনার কাছে আসিয়া থাকে, যাহাকে আপনি তন্ন তন্ন করিয়া পরীক্ষা করিলেও তাহার দেহস্থ কোনও যন্ত্র বা ধাতু (রস, রক্ত ইত্যাদি) বা তাহার দেহের কোনও অংশে কোনও পীড়া আছে বলিয়া আপনার মনে হইবে না, অথচ সে ব্যক্তি পীড়িত। এই কথার অর্থ কি? এই কথার অর্থ এই যে, তাহার পীড়া এখনও বিকশিত অবস্থায় আসে নাই, কোনও যন্ত্র বা দেহের কোনও অংশে এখনও আশ্রয়স্থির করে নাই, যদি এই অবস্থায় তাহাকে আরোগ্য করা না হয়, তবে কিছুদিন পরে ঐ রোগের ফল বাহিরে বিকশিত হইয়া উঠিবে। কিন্তু ইহাতে কোনও সন্দেহ নাই যে, এখনই সে ব্যক্তি পীড়িত। তাহা না হইলে তাহার নিদ্রা হয় না কেন? আহারে বেশ ইচ্ছা নাই কেন? সমাজে সকলের সঙ্গে মিশিয়া বেশ আনন্দে দিন যাপন করিতে তাহার ইচ্ছা হয় না কেন?
সর্বদাই তাহার মন 'উড় উড়' করে কেন? সর্বদাই তাহার মরিতে ইচ্ছা হয় কেন? আত্মীয়স্বজনের উপর তাহার মমতা বা স্বাভাবিক প্রীতি নাই কেন। লোকে কেং তাহাকে ত বলে নাই যে 'তুমি পীড়িত হইয়াছ', তবে সে কেন আপনার নিয়ো ভাহারে চিকিৎসা অন্বেষণ করে? এই সকল কথা উত্তমরূপে প্রণিধান করিলে জান আসিম, সেই ব্যক্তির কেন্দ্রস্থলে পীড়া আরম্ভ হইয়াছে, তবে এখনই তাহা হাড়দেহে বিকাশ প্রাপ্ত হয় নাই। কেন্দ্রস্থলে অর্থাৎ তাহার ইচ্ছাশক্তি, বোধ শক্তি, জড়া কল্পনা ইত্যাদিতে পীড়া আরম্ভ হইয়াছে তবে এখনও সূক্ষ্মভাবেই আছে কেন্দ্রস্থই আছে, এখনও পরিধিতে আসে নাই, এখনও সৃপ্ন হইতে স্কুলদেহে বা স্থলযন্ত্রাদি পর্যন্ত পৌছায় নাই। রোগটি কেন্দ্র হইতে পরিধিতে আসিবে-মন হইতে দেহে আসিবে, কেননা দেহ কেবলমাত্র অভ্যন্তরস্থিত সূক্ষ্ম মনের জড় প্রতিবিম্ব মাত্র। মনে যাহা থাকে, তাহাই জড় আকার ধারণ করিয়া দেহে প্রতিফলিত ও বিকশিত হয় মাত্র। আমাদের স্কুল ও জড়দেহ প্রথমে মনেই থাকে, পরে জড়ত্ব প্রাপ্ত হইয়া দেহ, দেহস্থ যন্ত্র বা রসরচাদি ধাতুতে পরিণত হয়। আমাদের মনের অবস্থা জড়ত্ব প্রাপ্ত হইয়া দেহে পরিণত হয় বলিয়াই মহাপ্রভু শ্রীগৌরাসদেব, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস প্রভৃতি পরম প্রেমিক মহাত্মাদের দেহ এত সুন্দর ও কমনীয় এবং যাহারা মনুষ্যবধ, ডাকাতি ইত্যাদি জঘন্য বৃত্তি সকল মনোমধ্যে পোষণ করে, তাহাদের দেহ বীভৎস ও কদর্য হইয়া থাকে। যেহেতু দেহ কেবলমাত্র মনের জড় প্রতিকৃতি মাত্র। রোগও প্রথমে কেন্দ্রস্থলে অর্থাৎ মানুষের মনে আরম্ভ হইয়া বাহিরে অর্থাৎ দেহে বিকাশ পায়, রোগ কখনই বাহির হইতে ভিতরে যায় না, ভিতর হইতে বাহিরে আসে এবং এইটিই তাহার স্বভাব। অতএব আরোগ্যও ভিতর হইতে বাহিরে অর্থাৎ আরোগ্য ভিতরে আরম্ভ হইয়া বাহিরের দিকে আসিবে, ইহাই আরোগ্যের স্বভাব। চিকিৎসকের কর্তব্য-এই সকল বিষয় প্রণিধানের সহিত হৃদয়ঙ্গম করা- কেবল হৃদয়ঙ্গম করিলেই হইবে না-তদনুসারে কার্য করিতে হইবে। আরোগ্য যখন ভিতর হইতে হইবে (কেননা রোগ ভিতর হইতে বাহিরে) তখন 'রোগীকে' অর্থাৎ মনুষ্যের কেন্দস্থলকে অর্থাৎ মনুষ্যের মন ও ইচ্ছাকে আরোগ্য করাই একমাত্র কর্তব্য। সেই আরোগ্যের স্রোত কেন্দ্রস্থল হইতে পরিধিতে প্রবাহিত হইয়া দেহকে ও দেহের যন্ত্রসকলকে আরাম করিবে। রোগের ফল নষ্ট করিলে রোগ সারিবে না, কার্য নষ্টে কারণের ধ্বংস হয় না। যক্ষ্মারোগী আপনার কাছে আসিলে আপনি নানা অণুবীক্ষণাদি যন্ত্রের সাহায্যে কতকগুলি কীটাণুকেই তাহার পীড়ার কারণ বলিয়া নিজেকে বড়ই পণ্ডিত বলিয়া মনে করিলেন, কিন্তু আপনার জানা উচিত ছিল যে, কীটাণুগুলি রোগের কারণ নয়, রোগের ফলে সেইগুলি আসিয়াছে, তাহারা নিরপরাধ। সেই কীটাণুগুলি মঙ্গলময়ের দূত বা অনুচর।তাহারা কোন সময় আসিয়া উপস্থিত হয়, সে বিষয়ে আপনার চিন্তা ও প্রণিধান আবশ্যক। একটি ফল যখন পড়ে, তখনই তাহাতে কীটাণু আদি আসিয়া সেই পচা ফল খাইয়া ফেলে, কীটাণুগুলি আসে বলিয়া ফলটি পচে না, ফলটি পচিলে তবে তাহারা আসে। তাহা ছাড়া তাহারা আসিয়া যেমন দূষিত দুর্গন্ধ অংশ ভক্ষণ করে, তেমনি যক্ষ্মার কীটাণুগুলি আমাদের শত্রু নয়, মঙ্গলময়ের দ্বারা প্রেরিত হইয়া ফুসফুসের পচা দুর্গন্ধ অংশগুলি খাইয়। পরিষ্কার করে। যক্ষ্মার কারণ আরও দূরে, পশ্চাতে বহু পশ্চাতে অবস্থিত। আপনার অজ্ঞতার জন্য পশ্চাতে যাইবার শক্তি নাই। যাহাকে সম্মুখে দেখেন, তাহাকেই কারণ ভাবেন এবং তাহাকেই শত্রু মনে করিয়া উৎফুল্ল হইয়া উঠেন। যক্ষ্মা বা যে কোনও রোগের কারণ এত স্কুল নয় বা এত সহজপ্রাপ্য নয়, সূক্ষ্মদৃষ্টি, প্রণিধান এবং সাধনা আবশ্যক। অতএব জানিতে হইবে যে, 'রোগী' সর্বাগ্রে মনকে দূষিত বা পীড়িত করে, পরে ক্রমে মন হইতে দেহে ও দেহযন্ত্রে আসে। আরোগ্যও মনে আরম্ভ হয়, পরে ভিতর হইতে বাহিরে গিয়া থাকে। এই কারণে মহাত্মা হ্যানিম্যান অনেকবার উপদেশ দিয়াছেন যে, রোগীর লক্ষণসমষ্টি দেখিয়া ঔষধ নির্বাচন কালে মনোলক্ষণগুলির উপর অধিক মনোযোগ দিতে হয়। আমরা 'আমি' শব্দে এখন কেবলমাত্র 'মন'কেই নির্দেশ করিলাম, কিন্তু 'আমি' আরও ভিতরে, আরও সূক্ষ্ম এবং পূর্ণ চৈতন্য-তবে বর্তমান বিষয়ের জন্য ততদূর আলোচনা করিবার প্রয়োজন নাই। মন ও মনোলক্ষণের প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া কার্য করিলেই হইবে।
এক্ষণে 'রোগ' বা 'রোগের' 'ডায়গনসিস' সম্বন্ধে কিছু বক্তব্য আছে। আপনি হোমিওপ্যাথ, আপনার 'রোগ' বা 'রোগের নাম' কোনও কাজে আসিবে না। আপনার কাজে আসিবে- কেবলমাত্র 'রোগী'। আপনার হাতে চারিটি রোগী অদ্য আসিল-একটির রক্তামাশয়, একটির সামান্য জ্বর ও দাঁতের গোড়ায় যাতনা, একটির অতিসার ও চতুর্থটির টাইফয়েড ফিভার বলিয়া ডাক্তারেরা নির্দেশ করিয়াছেন। যদিও প্রত্যেকের মানসিক উদ্বেগ, অস্থিরতা, দারুণ পিপাসা কিন্তু সামান্য সামান্য জলপান করা এবং প্রত্যেকেরই তাপে বিশেষ ইচ্ছা থাকে, তবে আর্সেনিক প্রত্যেকেরই ঔষধ হইবে। আবার মনে করুন-চারিটি রোগীরই কলেরা হইয়াছে-লক্ষণবিশেষে হয়ত একজনকে আর্সেনিক, দ্বিতীয়কে ভিরেট্রাম, তৃতীয়কে ক্যাফার ও চতুর্থকে হয়ত একোনাইট লাগিবে। অতএব 'রোগ' অনুসারে আপনার চিকিৎসা নয়- 'রোগী' অনুসারেই চিকিৎসা। 'রোগীর' ব্যক্তিগত লক্ষণের তারতম্যের উপর আপনার ঔষধ নির্বাচন নির্ভর করিবে, 'রোগের' নাম যাহাই হউক না কেন? ইহাতে আপনার আবশ্যক নাই- কেবল যে আবশ্যক নাই, তাহা নয়-রোগের নাম অনেক সময় ক্ষতি করে. কেননা প্রকৃত ঔষধ নির্বাচনে বাধা দিয়া থাকে, কাজেই রোগের নাম না জানাই ভাল। আপনার 'রোগীই' সর্বস্ব, তাহার ব্যক্তিগত লক্ষণ, তাহার অভিলাষ, তাহারদ্বেষ, তাহার লক্ষণের হ্রাসবৃদ্ধি, সময়ানুসারে মানসিক বা শারীরিক শান্তি ও অশান্তি, এই সকলই আপনার একান্ত প্রয়োজন। আমরা 'রোগীর' চিকিৎসা করিয়া থাকি, 'রোগের' চিকিৎসা করি না,-এই কথা সর্বদাই মনে রাখা অবশ্য কর্তব্য- পুস্তকের প্রতি পাতায় লিখিয়া রাখা কর্তব্য-বাড়ীর দেওয়ালের উপর খোদিত করা কর্তব্য।
আমরা বেশ দেখিতে পাই যে, ম্যালেরিয়া জ্বর যেখানে মড়কভাবে হইতেছে, ঐ জ্বর কখনও হয় না। আবার সেখানেও এমন কতকগুলি ব্যক্তি আছেন তাঁহাদের ঐ। সেখাব্যেক্তি আছেন, যাঁহাদের জ্বর যেন কিছুতেই আরাম হইতে চায় না। আমরা বলি যে, ম্যালেরিয়া বড় খারাপ বাষ্প বা ভয়ানক বিষাক্ত ইত্যাদি-অর্থাৎ বাহিরের জিনিসের উপর দোষ দিয়া থাকি, কিন্তু সেই স্থানে এরূপ লোকও আছেন যাঁহারা কখনও ঐ জ্বরে আক্রান্ত হন না, কেহ বা নানা চিকিৎসা সত্ত্বেও পরিত্রাণ পান না, এ বিষয়ে চিন্তা বা প্রণিধান করিয়া বুঝিবার চেষ্টা করি না। কেবল যাহার ক্রমাগত হইতে থাকে ডাক্তারবাবু তাহাকে অবিরত কুইনাইনের মাত্রা বাড়াইয়া খাইতে দেন, শেষে যখন নানা যন্ত্রাদি পর্যন্ত দূষিত হইয়া উঠে, তখন অনন্যোপায় হইয়া বলেন-'এখন চেঞ্জে যাও' অর্থাৎ বায়ু বা স্থান পরিবর্তন কর অর্থাৎ প্রকারান্তরে বলা হয় যে, আমার আর সাধ্য নাই, এক্ষণে স্থানান্তরে গিয়া আমাকে দায়িত্ব হইতে নিষ্কৃতি দাও।' যদি চিন্তা করা যায়, তবে বেশ সুন্দররূপে আমাদের মনে প্রতিভাত হইবে যে, 'ম্যালেরিয়া বা যে কোনও ব্যারাম উহাকে ছাড়িতে চায় না একথা বলা ভুল, ঐ ব্যক্তি ম্যালেরিয়াকে ছাড়িতে চায় না অথবা পারে না।' অর্থাৎ তাহার জীবনীশক্তির এই প্রকার ক্ষমতা নাই যে, তাহাকে সারাইয়া তুলিতে পারে, এই কথা বলাই সঙ্গত। একজনের জীবনীশক্তি এই প্রকার যে, কোনও প্রকার পীড়া তাহাকে অতি সহজেই আক্রমণ করিতে পারে না বা আক্রমণ করিলেও সে শীঘ্র সারিয়া উঠে, আর একজনের জীবনীশক্তি এই প্রকার যে তাহাকে অতি সহজেই যে কোনও পীড়াতে আক্রমণ করে এবং একবার আক্রমণ করিলে তাহার জীবনীশক্তি শীঘ্র তাহার হাত হইতে সহজে পরিত্রাণ লাভ করিতে পারে না। জীবনীশক্তির ক্ষমতার এই তারতম্যের কারণ কি? তবে কি মঙ্গলময় ভগবান আপনাকে ও আমাকে বিভিন্ন ক্ষমতাযুক্ত জীবনীশক্তি দিয়া পাঠাইয়াছেন? না তাহা নহে। ইহার প্রধান কারণ-আমরাই নিজেদের দোষে, আমাদের জীবনীশক্তির ক্ষমতাকে নষ্ট করি-কিরূপে বা কি কর্মদোষে, তাহা পরে বিবৃত হইবে। ফলতঃ এই সকল তারতম্যের একমাত্র হেতু আমাদের কর্ম-ইহা স্বতঃসিদ্ধ। যদি এই কথা প্রকৃত হয় যে, আমাদের নিজ কর্মদোষে জীবনীশক্তির পূর্ণ ক্ষমতাবিকাশে বাধা জন্মাইয়া নিজেরা নান্য পীড়া, অসুবিধা, অস্বচ্ছন্দতা ভোগ করি এবং বহিঃপ্রকৃতির অধীন হই, তবে পীড়ার চিকিৎসায় কি হইবে, আমাদের নিজের চিকিৎসাই কর্তব্য। দোষ কোথায়? দোষ অগ্রে আমাদের মনে-পরে মনহইতে বাহিরে, তবে ঔষধ কোথায় দেওয়া উচিত? শাখাচ্ছেন করিলে বৃক্ষ নষ্ট হয় না, মূলোচ্ছেদ না করিলে কিরূপে বৃষ্ণনাশের আশা করা যাইবে। প্রত্যেকের মন ও কর্মের প্রকৃতির তারতম্য অনুসারে পীড়ারও তারতম্য হয়। বঔষধও তদনুসারে বিভিন্ন প্রকৃতির হওয়া চাই- এবং ঔষধ এ শক্তির শক্তির। দ্বারা 'রোগী'কে আরোগ্য করিলেই চিকিৎসকের কর্তব্য সাধন হইল; আমরা এমনই স্কুলবুদ্ধি যে 'ধাঁড়ে ঘাস খায় ও তাঁতি বাঁধা যায়, আমরা নিজ কর্মদোষে বহিঃপ্রকৃতির অধীন হইয়া উঠিয়াছি। পূর্বদিক হইতে সামান্য শীতল বায়ু লাগাইয়া হয়ত আমার সর্দি কাশি হইল, অমনি বলিলাম-পূর্ব বায়ু বড় খারাপ, ইহাতে সর্দি কাশি হইয়া থাকে। কি ভ্রম। পূর্ব বায়ুর অপরাধ কি? আমার নিজের দোষ, তাহা দেখি না। পূর্ব বায়ুতে সকলের পীড়া হয় না কেন? যে ব্যক্তি সম্পূর্ণ সুস্থ তাহার পক্ষে শীত, বাত ও আতপ সমান সুখপ্রদ। দুগ্ধের দোষ কি? আমি আমার অবস্থা এরূপ করিয়াছি যে, সামান্য দুগ্ধ সেবন করিলেও পেট ফাঁপে, অজীর্ণ হয়, পাতলা বাহ্যে হয়। আবার কেহ বা দৃপ্ত সেবন না করিলে আদৌ স্বচ্ছন্দ বোধ করে না, তাহার কোষ্ঠবদ্ধ হয়। কাজেই এই দুই প্রকার বাক্তিই পীড়িত। যে প্রকৃত সুস্থ তাহার পক্ষে সকল দ্রব্যই সমান আনন্দপ্রদ, সকল দ্রব্যেই তাহার সমান প্রীতি। বালক নিজের অসতর্কতার জন্য পড়িয়া যায় এবং যে স্থানটায় পড়িয়া যায়; মনে করে, সেই স্থানটাই বড় দুষ্ট, সেই স্থানটি তাহাকে ফেলিয়া দিয়াছে, কাজেই বালকটি উঠিয়াই ঐ স্থানটিকে পদাঘাত করিয়া থাকে-আমারও তদ্রূপ। অগ্রেই আমার মনোদুষ্টি, তাহা হইতে আমি আমার পূর্ণ স্বাধীনতা হারাইয়া নিজেকে বাহ্য প্রকৃতির অধীন করিয়াছি, তবে পূর্ব বায়ুর অপরাধ কি? এক্ষণে প্রশ্ন হইতে পারে যে, কি উপায়ে আমরা 'আরোগ্য' করিতে পারি। কিরূপে জানা যাইবে যে, একটি রোগীর এই ঔষধটির প্রয়োজন, অন্য আর একটি রোগীর জন্য অন্য ঔষধের প্রয়োজন? কিরূপ করিয়া আমরা প্রকৃতস্থানে আঘাত করিয়া চিকিৎসকের কর্তব্য করিব? তাহার উত্তর- 'রোগীর লক্ষণসমষ্টিই আপনার একমাত্র পরিচালক, ঐ লক্ষণ সমষ্টিই' প্রকৃত রোগ কি প্রথায় বা কি প্রকার ভেষজ দ্রব্য প্রয়োজন, তাহার সূচনা করিবে। আপনি তদনুসারে ঔষধ নির্বাচন করিতে পারিবেন। 'রোগের নাম' আপনাকে সাহায্য করা দূরে থাকুক, অনেক সময় কু-পথে, অ-পথে লইয়া যাইবে কিন্তু লক্ষণসমষ্টিই আপনার একমাত্র সহায় হইয়া প্রকৃত ঔষধ নির্বাচনের সহায়তা করিবে এবং আরোগ্য পথে লইয়া বাইবে। অতএব আপনার অবশ্য প্রয়োজনীয়- (১) 'রোগী'-রোগ নয়। (২) লক্ষণসমষ্টি-রোগের 'নাম' নয়। এই 'রোগীই' তাহার লক্ষাসমষ্টির সাহায্যে আপনার চিকিৎসার বিষয়, একথা সর্বদাই মনে রাখিতে হইবে।


